বোয়ালমারীতে চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলা, লুটপাট, কিশোরী মেয়েকে অপহরণের হুমকি

print news

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:

image 5

২২ বছর রাস্তায় রাস্তায় মাটি কেটে ছেলে-বৌ ও ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে ছিলেন বৃদ্ধা নারী শ্রমিক নুরজাহান বেগম। এক কোমরে মাটির ঝুড়ি আর এক কোমরে ১বছরের শিশু নাতনি। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়কে উপেক্ষা করে বছরের পর বছর যে সুখের আশায় কষ্ট স্বীকার করে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। ছেলে বৌয়ের ৮ বছর প্রবাসযাপন ও ছেলের ১যুগ ধরে হাড়ভাংগা খাটুনির বিনিময়ে সে সুখ যখন হাতের নাগালে, সংসারে লেগেছে স্বচ্ছলতার ছোঁয়া। পুত্রবধূ আর নাতনীকে নিয়ে সামাজিক ভাবে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছেন নুরজাহান বেগম। ঠিক তখনই তাদের জীবনে নেমে এসেছে ঘোরান্ধকার। বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের সুখ মেনে নিতে বা তার উন্নত জীবন যাপন সহ্য করতে পারছে না এলাকার ধুরন্ধর স্বার্থান্বেষী একটি মহল। তাদের দৌরাত্ম্যে আর চাঁদাবাজীর কবলে পরে অসহায় পরিবারটি রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় নেমে এসেছে ভয়াল হিংস্র থাবা। শিকার হয়েছে অপপ্রচারের, এমনকি শারীরিক নির্যাতনেরও অভিযোগ তুলেছেন এই বৃদ্ধা। সম্প্রতি স্থানীয় ভাবে চাঁদা না পেয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রভাবশালী মহলটি লুট করে নিয়েছে তাদের তীলে তীলে গড়ে তোলা সংসারের সবকিছু। পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই নেই পরিবারটির। লুণ্ঠকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পড়েছেন বিপাকে। মামলা তুলে না নিলে স্থানীয় একটি মহিলা মাদ্রাসায় পড়ুয়া সপ্তম শ্রেণি শিক্ষার্থী একমাত্র নাতনিকে অপহরণের হুমকি দেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে তার পড়ালেখা।
উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের কোন্দারদিয়ায় রবিবার (১৯ এপ্রিল) বেলা ৩ টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কন্ঠে বিষয় গুলো তুলে ধরেন
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের রাঙামুলারকান্দী গ্রামের রেমিটেন্স যোদ্ধা, লিবিয়া প্রবাসী মনির মল্লিক মা অশীতিপর বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম। সম্প্রতি তার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী ফারুক মোল্যা ও তার ছেলে জিহাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হামলা, মালামাল লুট, শারীরিক নির্যাতন, অপপ্রচার ও মামলা তুলে না নিলে কিশোরী মেয়েকে অপহরনের হুমকির অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারটি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য রাখেন লিবিয়া প্রবাসী মনির মল্লিকের স্ত্রী আসমা বেগম। তিনি তার লিখিত বক্তব্যে বলেন- ” সংসারের অভাব অনটন মিটাতে প্রথমে আমার ১ বছর বয়সী মেয়েকে রেখে বিদেশে কাজ নিয়ে যাই, পরে আমার স্বামীকে লিবিয়া পাঠেয়ে আমি দেশে ফিরে আসি। আমার স্বামী দীর্ঘ ১ যুগ লিবিয়াতে কর্মরত রয়েছেন। গত ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে লিবিয়ার ত্রিপল্লীতে মাম্মি সুইটস বেকারি নামের একটি খাদ্যউৎপাদন কারখানা থেকে আমার স্বামীসহ চার বাংলাদেশিকে অপহরণ করে একটি মাফিয়া চক্র। অপহৃতদের মধ্যে ছিলেন মনির মল্লিক, জিহাদ মোল্যা, মিনহাজ শেখ ও সাব্বির। জিহাদ মোল্যা একই গ্রামের মো. ফারুক মোল্যার ছেলে। লিবিয়ায় একই কারখানায় আমার স্বামীর অধীনে কাজ করতেন তারা।
অপহরণের পর জিহাদের পরিবারের সাথে মুক্তিপণ চেয়ে যোগাযোগ করে মাফিয়া চক্র। সে সময় জিহাদসহ অন্যান্যদের মুক্ত করতে জিহাদের পিতা ফারুক মোল্যাকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার দেই। আমার দেওয়া টাকাসহ মোট ১০ লাখ টাকা মাফিয়া চক্রকে দিয়ে জিহাদকে মুক্ত করা হয়। অন্যান্য অপহৃতদের জন্য আলাদা মুক্তিপণ দাবি করে মাফিয়া চক্র। এসময় আমার স্বামী মনির মল্লিককে ছাড়াতে ফারুক মোল্যার মাধ্যমে মাফিয়া চক্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হলে প্রথমে ১০ লাখ টাকা ফারুক মোল্যার হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও মনির মুক্তি না পেলে ভিন্ন পথে তিন দফায় ৫০ লাখ টাকা দিয়ে মনির মল্লিককে মুক্ত করা হয়।”

আসমা বেগম আরো বলেন- জিহাদের মুক্তিপণ বাবদ হাওলাদ দেওয়া সাড়ে ৫ লাখ ও আমার স্বামীর মুক্তিপণ বাবদ দেওয়া ১০ লাখ টাকা মোট ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা জিহাদ দেশে এলে দাবি করায় তারা আমার পাওনা টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো আমার কাছে জিহাদের মুক্তিপণ ১০ লাখ টাকা দাবি করে। ও মাফিয়া চক্রের সাথে আমাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে এলাকায় অপপ্রচার চালাতে থাকে। জিহাদকে আমার স্বামী লিবিয়ায় না নিলেও তারা মিথ্যা ভিত্তিহীন ভাবে দাবি করছে যে তার ভিসা বাবদ আমাদের টাকা দিয়েছে অথচ তার কোনো দলিল তারা দিতে পারেনি। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার সালিশ বৈঠক হয়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছে অভিযুক্তরা। এমনকি আমার মেয়েকে অপহরণের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

প্রবাসীর মা নুরজাহান বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছি। এখন তার মুক্তিপণ নিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি আমাদের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

ভুক্তভোগী পরিবারের মেয়ে অভিযোগ করে বলেন, মাদরাসায় যাওয়া-আসার পথে তাকে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে এবং অপহরণের ভয় দেখানো হচ্ছে। এতে আতঙ্কে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।

অভিযুক্ত ফারুক ও তার ছেলে জিহাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, মালামাল লুটের একটি অভিযোগ পেয়ে পুলিশ দুইজনকে আটক করে আদালতে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি লুট হওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার করে ভুক্তভোগীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং ভুক্তভোগী পরিবার দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *